রাজনৈতিক শিষ্টাচারের অবক্ষয়: গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত | দৈনিক সময়ের নুর ডট কম
সম্পাদকীয়
রাজনীতি একটি দেশের রাষ্ট্র পরিচালনা, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দল, মতাদর্শ ও নেতৃত্বের মধ্যে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। বরং ভিন্নমতের সহাবস্থানই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।
কিন্তু যখন রাজনৈতিক মতবিরোধ ব্যক্তিগত আক্রমণ, অশালীন বক্তব্য, কটূক্তি, হুমকি, প্রতিহিংসা ও অসহিষ্ণুতায় রূপ নেয়, তখন তা শুধু রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেই কলুষিত করে না; গণতন্ত্রের ভিত্তিকেও দুর্বল করে দেয়। বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাজনৈতিক শিষ্টাচারের অবক্ষয় তাই গভীর উদ্বেগের বিষয়। এটি নিছক ভাষার সৌজন্য হারানোর সমস্যা নয়, বরং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও রাজনৈতিক জবাবদিহির ওপর এক গুরুতর আঘাত।
রাজনৈতিক শিষ্টাচার বলতে কেবল ভদ্র ভাষায় কথা বলা কিংবা আনুষ্ঠানিক সৌজন্য প্রকাশকে বোঝায় না। এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে প্রতিপক্ষের মতামতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, যুক্তির মাধ্যমে বিতর্কে অংশগ্রহণ, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা, ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে বিরত থাকা এবং রাজনৈতিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করা। একজন রাজনৈতিক নেতার বক্তব্য ও আচরণ শুধু তাঁর ব্যক্তিগত রুচির পরিচয় বহন করে না; এর মাধ্যমে তাঁর দল, রাজনৈতিক আদর্শ এবং গণতন্ত্রের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিও প্রকাশ পায়। ফলে রাজনৈতিক নেতৃত্বের মুখের ভাষা ও আচরণের দায় সাধারণ নাগরিকের তুলনায় অনেক বেশি।
দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আমাদের রাজনৈতিক পরিসরে অনেক ক্ষেত্রেই যুক্তি ও নীতিনির্ভর বিতর্কের পরিবর্তে ব্যক্তিগত আক্রমণ প্রাধান্য পাচ্ছে।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার পরিবর্তে তাঁকে হেয়প্রতিপন্ন করা, তাঁর বক্তব্যের জবাব না দিয়ে ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কটূক্তি করা কিংবা ভিন্নমতকে শত্রুতা হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা দেখা যায়। কখনো কখনো রাজনৈতিক বক্তব্যে এমন ভাষা ব্যবহার করা হয়, যা সমাজে বিভাজন, বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতাকে উসকে দেয়। এতে রাজনৈতিক বিতর্কের মান নষ্ট হয় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনীতি সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়।
গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো সহনশীলতা। গণতন্ত্রে সবাই একমত হবেন—এমন প্রত্যাশা অবাস্তব। বরং মতভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানোই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিচয়। একটি সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশে সরকার ও বিরোধী দল পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হবে, কিন্তু রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সহযোগিতার পথ খোলা রাখবে।
বিরোধী দলের সমালোচনাকে রাষ্ট্রবিরোধিতা হিসেবে দেখা যেমন অনুচিত, তেমনি সরকারের প্রতিটি উদ্যোগকে অন্ধভাবে প্রত্যাখ্যান করাও দায়িত্বশীল রাজনীতির পরিচায়ক নয়। সমালোচনা হতে হবে তথ্যভিত্তিক, যুক্তিনির্ভর ও জনস্বার্থকেন্দ্রিক। একইভাবে সমালোচনার জবাবও দিতে হবে যুক্তি ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে।
রাজনৈতিক শিষ্টাচারের অবক্ষয়ের অন্যতম ক্ষতিকর দিক হলো, এটি সমাজের অন্যান্য স্তরেও অসহিষ্ণুতার বিস্তার ঘটায়। রাজনৈতিক নেতারা যখন প্রকাশ্যে পরস্পরকে অসম্মান করেন, তখন তাঁদের অনুসারীদের একটি অংশও একই ধরনের আচরণে উৎসাহিত হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গালিগালাজ, অপপ্রচার, বিদ্বেষমূলক মন্তব্য এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য প্রচারের প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষকে প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, বরং শত্রু হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক বিশ্বাসের জন্য বিপজ্জনক। অথচ একটি রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও পারস্পরিক সম্মান ও সহাবস্থানের ভিত্তি অটুট থাকা অপরিহার্য।
এই অবক্ষয়ের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে যেকোনো মূল্যে দুর্বল করার মানসিকতা, দলীয় আনুগত্যের নামে অন্যায়কে সমর্থন, রাজনৈতিক জবাবদিহির ঘাটতি এবং নৈতিক নেতৃত্বের সংকট এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সাফল্যকে জনসেবার মানদণ্ডে না মেপে প্রতিপক্ষকে কতটা কোণঠাসা করা গেল, তার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়। ফলে নীতি, আদর্শ ও জনকল্যাণের চেয়ে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা এবং দলীয় স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে। এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা কমিয়ে দেয়।
রাজনৈতিক শিষ্টাচারের সঙ্গে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতারও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সংসদ, রাজনৈতিক সভা, সংবাদ সম্মেলন কিংবা জনসমাবেশ—সব ক্ষেত্রেই শালীন ও যুক্তিনির্ভর আচরণ গণতান্ত্রিক পরিবেশকে সমৃদ্ধ করে।
সংসদে বিরোধী মতের প্রতি সম্মান, জনসমক্ষে দায়িত্বশীল বক্তব্য এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে স্বচ্ছতা থাকলে জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পায়। বিপরীতে, রাজনৈতিক পরিসরে অপমান, হুমকি ও অসহিষ্ণুতা স্বাভাবিক হয়ে উঠলে প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। এতে রাজনৈতিক সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর মানুষের আস্থা দুর্বল হয়।
এখানে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গণমাধ্যমের কাজ শুধু রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য প্রচার করা নয়; বরং বক্তব্যের সত্যতা যাচাই, জনস্বার্থের বিষয়গুলো সামনে আনা এবং অসংগতিপূর্ণ আচরণকে যুক্তিনির্ভরভাবে বিশ্লেষণ করাও তার দায়িত্ব।
তবে সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠতা, নিরপেক্ষতা ও পেশাগত নৈতিকতা বজায় রাখা জরুরি। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদেরও তথ্য যাচাই না করে কোনো বক্তব্য ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা ভিন্নমতের মানুষের বিরুদ্ধে অপমানজনক মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকা উচিত। নাগরিকদের সচেতন অংশগ্রহণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইতিবাচক পরিবর্তনে সহায়ক হতে পারে।
রাজনৈতিক শিষ্টাচার ফিরিয়ে আনতে হলে প্রথমেই রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। দলীয় কর্মসূচি, সভা-সমাবেশ ও প্রচার-প্রচারণায় শালীন ভাষা ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নেতাকর্মীদের মধ্যে রাজনৈতিক
সহনশীলতা, সাংবিধানিক মূল্যবোধ, মানবিক মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক আচরণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। কোনো নেতা বা কর্মী প্রকাশ্যে অশালীন বক্তব্য দিলে কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হুমকি দিলে দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে তার নৈতিক ও সাংগঠনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আইন লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে এসব পদক্ষেপ যেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার ও সামাজিক সংগঠনগুলোকেও সহনশীলতার শিক্ষা প্রসারে ভূমিকা রাখতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে বোঝাতে হবে যে, ভিন্নমত পোষণ করা অপরাধ নয় এবং যুক্তি দিয়ে মতের বিরোধিতা করা গণতান্ত্রিক অধিকার। কাউকে অসম্মান না করেও কঠোর সমালোচনা করা সম্ভব।
একইভাবে রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতার কারণে কোনো নাগরিকের অধিকার খর্ব করা কিংবা তাঁর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন কেবল আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন মূল্যবোধের বিকাশ, নৈতিক শিক্ষা এবং ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাজনৈতিক শিষ্টাচার প্রতিষ্ঠার দায় কোনো একটি দল বা পক্ষের একার নয়। সরকার, বিরোধী দল, রাজনৈতিক সংগঠন, জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যম এবং সাধারণ নাগরিক—সবারই নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। কোনো পক্ষের অসংগত আচরণকে অন্য পক্ষের একই ধরনের আচরণের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে পারস্পরিক সংযম, সহনশীলতা ও নীতিনিষ্ঠ চর্চার মাধ্যমে। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়; কিন্তু তাদের বক্তব্য, আচরণ ও সিদ্ধান্তের প্রভাব সমাজে দীর্ঘদিন থেকে যায়।
পরিশেষে বলা যায়, রাজনৈতিক শিষ্টাচারের অবক্ষয়কে সামান্য বিষয় মনে করার সুযোগ নেই।
এটি গণতন্ত্রের জন্য একটি অশনিসংকেত। যে রাজনীতিতে ভিন্নমতের প্রতি সম্মান থাকে না, সেখানে সুস্থ বিতর্ক বিকশিত হয় না; যে রাজনীতিতে যুক্তির পরিবর্তে অপমান প্রাধান্য পায়, সেখানে জনগণের সমস্যা আড়ালে পড়ে যায়; আর যে রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে শত্রু মনে করা হয়, সেখানে জাতীয় ঐক্য ও সামাজিক সম্প্রীতি হুমকির মুখে পড়ে। বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম সৌজন্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং জনস্বার্থে সহযোগিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, সমালোচনাও থাকবে—কিন্তু তা যেন কখনো শালীনতা, মানবিক মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সীমা অতিক্রম না করে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি নিজেদের আচরণে এই দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে, তবেই রাজনীতিকে জনগণের আস্থার জায়গায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
