ইবলিস কি ফেরেশতাদের শিক্ষক ছিল? | দৈনিক সময়ের নুর ডট কম
অধ্যক্ষ মো.আবদুন নুর :
ইসলামি ইতিহাস ও ধর্মীয় আলোচনায় প্রায়ই একটি কথা শোনা যায়—ইবলিস নাকি ফেরেশতাদের শিক্ষক ছিল। কেউ কেউ বলেন, সে দীর্ঘদিন আল্লাহর ইবাদত করেছে এবং ফেরেশতাদের শিক্ষা দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বক্তব্যের পক্ষে কোরআন ও সহিহ হাদিসে কি কোনো সুস্পষ্ট দলিল রয়েছে? নাকি এটি পরবর্তী যুগের কিছু বর্ণনা ও তাফসিরভিত্তিক আলোচনার অংশ? বিষয়টি সঠিকভাবে বুঝতে হলে প্রথমেই কোরআনের স্পষ্ট বক্তব্যের দিকে ফিরে যেতে হবে।
প্রথমত, কোরআন ইবলিসের পরিচয় অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে দিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা সূরা আল-কাহফের ৫০ নম্বর আয়াতে বলেন— “আর যখন আমি ফেরেশতাদের বললাম, ‘তোমরা আদমকে সিজদা করো’, তখন তারা সবাই সিজদা করল; কিন্তু ইবলিস নয়। সে ছিল জিনদের অন্তর্ভুক্ত। অতঃপর সে তার প্রতিপালকের আদেশ অমান্য করল।” (সূরা আল-কাহফ, ১৮:৫০)। এই আয়াতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো—“কানা মিনাল জিন্নি”, অর্থাৎ “সে ছিল জিনদের অন্তর্ভুক্ত।” সুতরাং কোরআনের সরাসরি বক্তব্য অনুযায়ী ইবলিস ফেরেশতা ছিল না; সে ছিল জিন।
দ্বিতীয়ত, ইবলিস কেন ফেরেশতাদের সঙ্গে উপস্থিত ছিল—এ প্রশ্নের উত্তর তাফসিরে পাওয়া যায়। ইবন কাসির (রহ.) সূরা আল-কাহফ ৫০ নম্বর আয়াতের তাফসিরে উল্লেখ করেন যে, ইবলিস ফেরেশতাদের মতো ইবাদত ও আনুগত্যের আচরণ করত এবং সে কারণে ফেরেশতাদের সঙ্গে থাকা ও তাদের উদ্দেশে দেওয়া আদেশের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। কিন্তু তার প্রকৃত সৃষ্টি ছিল জিনদের মধ্য থেকে। অর্থাৎ ফেরেশতাদের সঙ্গে অবস্থান করা এবং ফেরেশতা হওয়া—দুটি এক বিষয় নয়।
তৃতীয়ত, সহিহ হাদিসও ইবলিসের জিন-পরিচয়কে সমর্থন করে। উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “ফেরেশতাদের নূর থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে, জিনদের আগুনের শিখা থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং আদমকে সেই উপাদান থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে যা তোমাদের কাছে বর্ণনা করা হয়েছে।” এটি সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৯৯৬-এ বর্ণিত।
চতুর্থত, ইবলিস নিজেই তার সৃষ্টিগত পার্থক্যের কথা স্বীকার করেছিল। আদম (আ.)-কে সিজদা করতে অস্বীকার করার সময় সে বলেছিল— “আমি তার চেয়ে উত্তম; আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে।” (সূরা আল-আ‘রাফ, ৭:১২; সূরা সাদ, ৩৮:৭৬)। অর্থাৎ ইবলিস নিজের সৃষ্টি আগুন থেকে এবং আদম (আ.)-এর সৃষ্টি মাটি থেকে—এই পার্থক্যকে শ্রেষ্ঠত্বের যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করেছিল। তার এই অহংকারই তাকে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করার দিকে নিয়ে যায়।
পঞ্চমত, “ইবলিস ফেরেশতাদের শিক্ষক ছিল”—এ দাবির বিষয়ে তাফসিরের বর্ণনাগুলো সতর্কতার সঙ্গে বুঝতে হবে। ইবন কাসির (রহ.) তাঁর তাফসিরে ইবন আব্বাস (রা.)-এর নামে কিছু বর্ণনা এবং অন্যান্য সালাফের কিছু বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। এসব বর্ণনায় ইবলিসের ফেরেশতাদের সঙ্গে অবস্থান, ইবাদতে তার কঠোরতা, এমনকি তার জ্ঞান ও মর্যাদা সম্পর্কে বিভিন্ন কথা পাওয়া যায়। কোথাও তাকে আসমানের দায়িত্বশীল বা জান্নাতের প্রহরী বলা হয়েছে; কোথাও বলা হয়েছে, সে প্রচুর ইবাদত করত। তবে এসব বর্ণনা সহিহ মারফু হাদিস হিসেবে প্রমাণিত নয়। বরং ইবন কাসির নিজেই উল্লেখ করেছেন যে এ ধরনের বহু বর্ণনার মধ্যে ইসরাইলিয়াতের প্রভাব রয়েছে এবং এগুলোর অনেকগুলো গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে দুর্বল বা অনির্ভরযোগ্য।
ষষ্ঠত, “ইবলিস ফেরেশতাদের শিক্ষক ছিল”—এই নির্দিষ্ট দাবির পক্ষে কোরআন বা সহিহ হাদিসে কোনো সুস্পষ্ট দলিল পাওয়া যায় না। তাই এটিকে নিশ্চিত ইসলামী আকিদা বা অকাট্য ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না। বলা যেতে পারে—কিছু তাফসিরি ও ঐতিহাসিক বর্ণনায় ইবলিসের ব্যাপারে এমন কথা পাওয়া যায় যে সে ফেরেশতাদের সঙ্গে অবস্থান করত, তাদের মতো ইবাদত করত এবং তার জ্ঞান ও ইবাদত ছিল উল্লেখযোগ্য। কিন্তু “সে ফেরেশতাদের শিক্ষক ছিল”—এটি কোরআন-হাদিসের প্রতিষ্ঠিত বক্তব্য নয়।
সপ্তমত, আদম (আ.)-কে সিজদার ঘটনায় ইবলিসের আসল চরিত্র প্রকাশ পায়। আল্লাহ যখন ফেরেশতাদের আদম (আ.)-কে সম্মানসূচক সিজদা করার নির্দেশ দিলেন, তখন ফেরেশতারা বিনা দ্বিধায় আল্লাহর আদেশ পালন করেন। কিন্তু ইবলিস অহংকার করে তা প্রত্যাখ্যান করে। কোরআনে তার বক্তব্য এসেছে— “আমি কি এমন ব্যক্তিকে সিজদা করব, যাকে আপনি মাটি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন?” (সূরা আল-ইসরা, ১৭:৬১)। তার পতনের মূল কারণ ছিল জ্ঞান বা ইবাদতের অভাব নয়; বরং অহংকার, আল্লাহর নির্দেশের বিরুদ্ধে অবাধ্যতা এবং নিজের শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা।
অষ্টমত, ইবলিসের ঘটনা মানুষের জন্য গভীর শিক্ষা বহন করে। কেউ অনেক জ্ঞান অর্জন করতে পারে, দীর্ঘদিন ইবাদত করতে পারে, সম্মানজনক অবস্থান লাভ করতে পারে—কিন্তু অন্তরে অহংকার জন্মালে সেই জ্ঞান ও ইবাদত তাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারে। ইবলিসের বিপর্যয় আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে আল্লাহর কাছে প্রকৃত মর্যাদার ভিত্তি হলো তাঁর আনুগত্য ও বিনয়। তাই শুধু বাহ্যিক আমল নয়, অন্তরের অবস্থাও সংশোধন করা প্রয়োজন।
নবমত, ইবলিসের পরিচয় ও তার পতন সম্পর্কে কোরআনের বক্তব্যই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি। সূরা আল-কাহফ ৫০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ একদিকে জানিয়ে দিয়েছেন যে ইবলিস জিনদের অন্তর্ভুক্ত, অন্যদিকে তার অবাধ্যতার কথাও বলেছেন। সহিহ মুসলিমের হাদিস ফেরেশতা ও জিনের সৃষ্টিগত পার্থক্য স্পষ্ট করেছে। আর তাফসিরের অতিরিক্ত বর্ণনাগুলোকে কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে যাচাই করে গ্রহণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ইবন কাসিরের সতর্কতাও গুরুত্বপূর্ণ—অনেক পুরনো বর্ণনা ইসরাইলিয়াতের উৎস থেকে এসেছে এবং সবগুলো নির্ভরযোগ্য নয়।
দশমত, সারকথা হলো—ইবলিস ফেরেশতা ছিল না এবং তাকে ফেরেশতাদের শিক্ষক বলা কোরআন বা সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়। সে ছিল জিন। তবে আল্লাহর বিশেষ হিকমতে সে ফেরেশতাদের সঙ্গে অবস্থান করেছিল এবং তাদের সঙ্গে দেওয়া আদেশের আওতায় এসেছিল—এটি কোরআনের বর্ণনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং তাফসিরে এর ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়। কিন্তু তার অতীত মর্যাদা, জ্ঞান বা ইবাদত সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা থাকলেও সেগুলোকে সহিহ হাদিসের পর্যায়ে উন্নীত করা উচিত নয়। ইসলামী জ্ঞানচর্চায় তাই সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি হলো—যেখানে কোরআন ও সহিহ হাদিস স্পষ্ট, সেখানে সেটিই চূড়ান্ত দলিল; আর যেখানে তাফসিরি বা ঐতিহাসিক বর্ণনা রয়েছে, সেখানে তার গ্রহণযোগ্যতা ও সনদ বিবেচনা করা।
উপসংহার :
“ইবলিস ফেরেশতাদের শিক্ষক ছিল”—এই বাক্যটি প্রচলিত হলেও এটিকে কোরআন-হাদিসের অকাট্য সত্য বলা যায় না। কোরআনের স্পষ্ট ঘোষণা হলো—“সে ছিল জিনদের অন্তর্ভুক্ত” (আল-কাহফ, ১৮:৫০)। সহিহ মুসলিমের হাদিসও ফেরেশতা ও জিনের পৃথক সৃষ্টি সম্পর্কে সুস্পষ্ট তথ্য দিয়েছে। আর প্রসিদ্ধ তাফসিরে ইবলিসের ফেরেশতাদের সঙ্গে অবস্থান ও ইবাদতের বিষয়ে কিছু বর্ণনা থাকলেও সেগুলোর সবগুলো সহিহ নয়। অতএব, ইবলিসের প্রকৃত শিক্ষা হলো—জ্ঞান, ইবাদত ও মর্যাদা কোনো কিছুই অহংকারের বিকল্প নয়; আল্লাহর আদেশের সামনে বিনয় ও আনুগত্যই বান্দার প্রকৃত সফলতা।
