
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন :
রাজধানীর ফার্মগেটে অবস্থিত তেজগাঁও কলেজ দীর্ঘদিন ধরে উচ্চশিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। কলেজটির নিজস্ব ওয়েবসাইটেও প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। �
Tejgaon College +1
তবে সম্প্রতি কলেজটির প্রশাসনিক কার্যক্রম, শিক্ষক নিয়োগ, বিভিন্ন কমিটিতে সদস্য অন্তর্ভুক্তি, হোস্টেল ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক কর্মকাণ্ড নিয়ে একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে।
অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে প্রভাষক মো. জহিরুল ইসলামের নিয়োগ প্রক্রিয়া, হোস্টেল ফি আদায়, দায়িত্ব পালন, বিভিন্ন কমিটিতে অন্তর্ভুক্তি এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওঠা প্রশ্ন।
তবে এসব অভিযোগের কোনোটিই আদালত বা সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য প্রতিবেদকের হাতে নেই। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে নথিপত্র, নিয়োগসংক্রান্ত রেকর্ড, আর্থিক হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি।
জহিরুল ইসলামের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন
কলেজের এক কর্মকর্তার অভিযোগ, প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মো. জহিরুল ইসলামের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ২০১৭/২০১৮ সালের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, প্যানেলভুক্তি এবং পরবর্তী সময়ে নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, জহিরুল ইসলাম ২০২৪ সালের ২০ আগস্ট কলেজে যোগদান করেন।
এখন মূল প্রশ্ন হলো—তাঁর নিয়োগ কোন বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে, কোন নির্বাচন বোর্ডের মাধ্যমে, কোন প্যানেল থেকে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কী কী অনুমোদনের ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়েছে?
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী, অধিভুক্ত বেসরকারি কলেজের শিক্ষক নিয়োগ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিধিমালার আওতায় পরিচালিত হয় এবং শিক্ষক নিয়োগে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি মনোনয়নের ব্যবস্থাও রয়েছে। �
NU Bangladesh +1
অতএব, নিয়োগসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি, আবেদনকারীদের তালিকা, নির্বাচনী বোর্ডের কার্যবিবরণী, প্যানেল, নিয়োগপত্র, যোগদানপত্র এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট অনুমোদন যাচাই করলেই অভিযোগটির প্রকৃত ভিত্তি নির্ধারণ করা সম্ভব।
হোস্টেল ফি আদায়ের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, হোস্টেলের দায়িত্ব পালনকালে প্রতি মাসে গড়ে ৬০ থেকে ৭০ জন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ৭০০ টাকা করে আদায় করা হতো।
অভিযোগকারীদের দাবি, গত দেড় বছরে এভাবে কয়েক লাখ টাকা সংগ্রহ করা হলেও পুরো অর্থ কলেজের তহবিলে জমা দেওয়া হয়নি।
তবে এই অভিযোগের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কত টাকা আদায় হয়েছে, কার কাছে জমা হয়েছে, কোনো রসিদ দেওয়া হয়েছে কি না এবং কলেজের হিসাববহিতে তা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কি না—এসব যাচাই না করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না।
তাই সংশ্লিষ্ট সময়ের—
হোস্টেল রেজিস্টার,
শিক্ষার্থীদের ফি আদায়ের রসিদ,
ব্যাংক হিসাব,
ক্যাশবুক,
আয়-ব্যয়ের বিবরণী,
অডিট রিপোর্ট
পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
হোস্টেল দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি ও পরবর্তী ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
অভিযোগ রয়েছে, তেজগাঁও কলেজে সাকিব হত্যাকাণ্ডের পর জহিরুল ইসলামকে হোস্টেলের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়েও তিনি হোস্টেল সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন কি না—এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে সত্যতা জানতে প্রয়োজন হবে দায়িত্ব অর্পণ ও অব্যাহতির অফিস আদেশ, হোস্টেল কমিটির নথি এবং বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির সরকারি/প্রাতিষ্ঠানিক রেকর্ড।
চাঁদা দাবি ও হুমকির অভিযোগ
জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে চাঁদা দাবি এবং হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
এ ধরনের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। তবে কার কাছ থেকে কখন কী পরিমাণ অর্থ দাবি করা হয়েছে, কোনো লিখিত অভিযোগ রয়েছে কি না, অডিও/ভিডিও বা প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য আছে কি না—এসব যাচাই ছাড়া অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত ঘটনা হিসেবে প্রকাশ করা সমীচীন নয়।
অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ থাকলে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করে তদন্তের দাবি জানানো যেতে পারে।
বিভিন্ন কমিটিতে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগ রয়েছে, কলেজের অপেক্ষাকৃত জুনিয়র ও অস্থায়ীভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও জহিরুল ইসলাম বিভিন্ন কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন এবং এসব কমিটির মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা পেয়েছেন।
এখানেও প্রশ্ন হলো—কোন কমিটির সদস্য ছিলেন, কে তাঁকে মনোনয়ন দিয়েছেন, কমিটি গঠনের আদেশ কী এবং সেই কমিটির মাধ্যমে তিনি কোনো সম্মানী বা আর্থিক সুবিধা পেয়েছেন কি না।
এসব তথ্য অফিসিয়াল নথি থেকে যাচাই করা সম্ভব।
অডিটোরিয়াম ব্যবস্থাপনা নিয়েও অভিযোগ
তেজগাঁও কলেজের অডিটোরিয়াম বরাদ্দ ও ব্যবস্থাপনায় আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও সামনে এসেছে।
অভিযোগটির সত্যতা যাচাই করতে অডিটোরিয়াম বুকিং রেজিস্টার, বরাদ্দের অনুমোদন, ভাড়া/ফি নির্ধারণ, আদায়কৃত অর্থের রসিদ এবং ব্যাংক/ক্যাশবুকের হিসাব পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারের অভিযোগ
কিছু শিক্ষক-কর্মচারীর অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর বা অসমর্থিত তথ্য প্রচার করে হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করা হয়েছে।
এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রেও পোস্ট, স্ক্রিনশট, লিংক, প্রকাশের তারিখ এবং সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টের পরিচয় যাচাই করা জরুরি।
কোন কর্তৃপক্ষ তদন্ত করতে পারে?
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী, অধিভুক্ত কলেজের প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পরিদর্শন এবং অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তের ব্যবস্থা রয়েছে। শিক্ষক নিয়োগও সংশ্লিষ্ট জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বিধিমালার আওতাভুক্ত। �
NU Bangladesh
তাই অভিযোগের ধরন অনুযায়ী—
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়: নিয়োগ, অনুমোদন, শিক্ষক-কর্মচারীর চাকরির শর্ত এবং কলেজ প্রশাসনসংক্রান্ত বিষয় তদন্ত করতে পারে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়/মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ: প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক): অভিযোগে সরকারি অর্থ, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ, আত্মসাৎ বা দুর্নীতির উপাদান থাকলে এবং কমিশনের এখতিয়ার প্রযোজ্য হলে নিজস্ব আইন ও প্রক্রিয়া অনুযায়ী বিষয়টি পরীক্ষা করতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী/আদালত: হুমকি, চাঁদাবাজি, জালিয়াতি বা অন্য কোনো ফৌজদারি অপরাধের নির্দিষ্ট প্রমাণ থাকলে প্রচলিত আইনে পৃথক ব্যবস্থা হতে পারে।
তবে কোন ধারায় কী শাস্তি হবে তা অভিযোগের প্রকৃতি ও তদন্তে প্রমাণিত তথ্যের ওপর নির্ভরশীল। তদন্তের আগে নির্দিষ্ট শাস্তি ঘোষণা করা আইনগতভাবে যথাযথ নয়।
বিভাগীয় তদন্তের দাবি
অভিযোগগুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি উঠতে পারে।
তদন্ত কমিটির দায়িত্ব হতে পারে—
১. জহিরুল ইসলামের সম্পূর্ণ নিয়োগ ফাইল পরীক্ষা করা।
২. নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও প্যানেল যাচাই করা।
৩. নির্বাচন বোর্ডের কার্যবিবরণী পরীক্ষা করা।
৪. জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন যাচাই করা।
৫. হোস্টেল ফি আদায়ের হিসাব পরীক্ষা করা।
৬. ব্যাংক ও ক্যাশবুকের হিসাব মিলিয়ে দেখা।
৭. অডিটোরিয়াম বরাদ্দ ও আয়-ব্যয়ের হিসাব পরীক্ষা করা।
৮. বিভিন্ন কমিটিতে সদস্য হওয়ার বৈধতা যাচাই করা।
৯. অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত উভয় পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ করা।
১০. তদন্ত শেষে লিখিত প্রতিবেদন প্রকাশ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করা।
তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে :
যদি তদন্তে নিয়োগ বিধিমালা লঙ্ঘন, আর্থিক অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার, জাল নথি ব্যবহার বা অন্য কোনো শাস্তিযোগ্য অনিয়ম প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট বিধি ও আইনের আওতায় বিভাগীয় শাস্তি, অর্থ ফেরত/আদায়, নিয়োগের বৈধতা পুনঃপরীক্ষা এবং প্রয়োজন হলে ফৌজদারি বা দুর্নীতি দমন সংক্রান্ত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
অন্যদিকে অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রচারিত অভিযোগের বিষয়ে সংশোধন ও পরিষ্কার বক্তব্য প্রকাশ করাও জরুরি।
শেষ প্রশ্ন—তেজগাঁও কলেজের অনিয়মের লাগাম টেনে ধরবে কে?
তেজগাঁও কলেজের মতো একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ শুধু একজন শিক্ষক বা প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে ঘিরে নয়; এর সঙ্গে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মচারী ও অভিভাবকদের স্বার্থ জড়িত।
তাই অভিযোগগুলো রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণার ভিত্তিতে নয়—নথি, হিসাব, বিধিমালা ও নিরপেক্ষ তদন্তের ভিত্তিতে যাচাই হওয়া প্রয়োজন।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই বলছে, কলেজ থেকে অভিযোগ এলে পরিদর্শন বিভাগ তদন্ত করে এবং তদন্ত দলের সুপারিশের ভিত্তিতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। �
NU Bangladesh
অতএব, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন একটাই—
নিয়োগ থেকে আর্থিক ব্যবস্থাপনা—তেজগাঁও কলেজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ নথিভিত্তিক তদন্ত হবে কবে? আর অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে কে?
“অভিযোগ প্রমাণিত হলে শুধু বিভাগীয় শাস্তিই নয়, অভিযোগের ধরন অনুযায়ী ফৌজদারি আইনে মামলাও হতে পারে। নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়ম, জাল নথি, প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাৎ, প্রতারণা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট বিধি ও প্রচলিত আইনে দায় নির্ধারণের সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষক হিসেবে তাঁর বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট সার্ভিস রেগুলেশন অনুযায়ী বিভাগীয় তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। তবে কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী ঘোষণা নয়—তদন্তে অভিযোগের সত্যতা, দায় ও প্রযোজ্য আইন নির্ধারিত হওয়াই হবে আইনসম্মত প্রক্রিয়া