নিজস্ব প্রতিনিধি :
লক্ষ্মীপুরে একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএড পরীক্ষার জাল সনদ ব্যবহার করে চাকরি নেওয়ার অভিযোগের তদন্তে পক্ষপাতের অভিযোগ উঠেছে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা গৌতম চন্দ্র মিত্রের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারী শিক্ষক নেতা দাবি করেছেন, নিয়োগের সময় ব্যবহৃত কথিত বিএড সনদটি যাচাই না করেই একটি ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সনদের ভিত্তিতে তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছেন শিক্ষা কর্মকর্তা।
এ ঘটনায় ওই তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে (নারাজি) বিচার বিভাগীয় তদন্তের আবেদন জানিয়েছেন অভিযোগকারী সদর উপজেলা শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম খলিল। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে তিনি গত ১ জুন জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করেন।
অভিযোগকারী ইব্রাহিম খলিল বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার মুনছুর আহম্মদ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ কামাল হোসেনের বিরুদ্ধে গত ৪ মার্চ জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন শিক্ষক নেতা ইব্রাহিম খলিল।
অভিযোগে বলা হয়, কামাল হোসেন ঢাকার নিউ রাজধানী প্রশিক্ষণ কলেজ থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০১ সালের বিএড সনদ দেখিয়ে মুনছুর আহম্মদ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ পান। তিনি ২০১৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ওই পদে যোগদান করেন।
অভিযোগকারীর দাবি, একই সনদ ব্যবহার করে কামাল হোসেন ২০১৫ সালের ৩০ মে সদর উপজেলার হাসন্দি বিজয়নগর নারী শিক্ষা নিকেতন এবং ২০১৯ সালের ২৪ জুন পৌর শহীদ স্মৃতি একাডেমির প্রধান শিক্ষক পদেও আবেদন করেন।
পরে ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ওই সনদ যাচাই করা হলে ফলাফল ‘ফেল’ বলে জানানো হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সনদটির প্রকৃত শিক্ষাবর্ষ ২০০০-২০০১ বলে জানানো হয়।
অভিযোগের পর বিষয়টি তদন্তের জন্য জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা গৌতম চন্দ্র মিত্রকে দায়িত্ব দেন জেলা প্রশাসক। অভিযোগকারীর দাবি, তদন্তের সময় নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএড সনদটি যাচাই-বাছাই করার কথা থাকলেও তা করা হয়নি।
তার অভিযোগ, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নিজ কার্যালয়ে সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে তদন্ত না করে বিদ্যালয়ে গিয়ে তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করেন। অভিযোগকারী ইব্রাহিম খলিল বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর আগেই শিক্ষা কর্মকর্তা তদন্ত শেষ করে চলে যান বলেও তিনি দাবি করেন।
এরপর গত ২০ এপ্রিল শিক্ষা কর্মকর্তা জেলা প্রশাসকের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। অভিযোগকারীর দাবি, প্রতিবেদনে নিয়োগের সময় ব্যবহৃত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএড সনদের পরিবর্তে ‘দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের বিএড সনদকে ভিত্তি হিসেবে নেওয়া হয়েছে।
তবে অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, কামাল হোসেনের নিয়োগের সময় কিংবা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে আবেদনের ক্ষেত্রে ‘দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা’র সনদটি ব্যবহার করা হয়নি। ফলে ওই সনদের ভিত্তিতে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ২০১৯ সালের ৪ আগস্ট কামাল হোসেনের বিএসএস (পাস) ও বিএড সনদের সত্যায়ন করেন তৎকালীন সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু তালেব।
অভিযোগকারীর দাবি, দুটি সনদেই একই রেজিস্ট্রেশন নম্বর—১৩৭৬৫৫—এবং একই শিক্ষাবর্ষ ১৯৯৬-৯৭ উল্লেখ রয়েছে। তার ভাষ্য, স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়া বিএড করার সুযোগ না থাকায় একই রেজিস্ট্রেশন নম্বর ও শিক্ষাবর্ষ উল্লেখ থাকা বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন ছিল।
অভিযোগকারীর দাবি, ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সনদটি যাচাই করার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, সংশ্লিষ্ট বিএড পরীক্ষার ফলাফল ‘ফেল’। একই সঙ্গে পরীক্ষার সঠিক শিক্ষাবর্ষ ২০০০-২০০১ বলে জানানো হয়।
জাল সনদ সত্যায়নের অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) বিকেলে সাবেক সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু তালেবের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হয়।
তিনি ফোন রিসিভ করলেও সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর নেটওয়ার্ক সমস্যার কথা বলে ‘হ্যালো, হ্যালো’ বলতে থাকেন। পরে কলটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি আর কল রিসিভ করেননি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, ‘সনদের বিষয়ে অভিযোগের তদন্ত শেষ। এগুলো নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার কিছু নেই।’
অভিযোগের বিষয়ে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা গৌতম চন্দ্র মিত্র বলেন, ‘আমি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। শিক্ষক কামালের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএড সনদ নেই। তাঁর কাছে আমি মূল সনদ চেয়েছি। তিনি আমাকে “দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা” প্রতিষ্ঠানের সনদ দিয়েছেন।’
তবে যে সনদ দিয়ে কামাল হোসেন প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে, সেটির বিষয়ে কোনো তদন্ত করা হয়নি বলেও স্বীকার করেন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, ‘যে সনদ দিয়ে কামাল প্রধান শিক্ষক হয়েছেন, ওই সনদের কোনো তদন্ত আমি করিনি।’
এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।
জেলা প্রশাসনের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে জানতে লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসক এস এম মেহেদী হাসানের দাপ্তরিক মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
তবে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মেজবা উল আলম ভূঁইয়া বলেন, ‘প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দেওয়ার অভিযোগটি আমার জানা নেই। এ বিষয়ে খোঁজ-খবর নেওয়া হবে।’
অভিযোগকারী শিক্ষক নেতা ইব্রাহিম খলিল বলেন, নিয়োগের সময় ব্যবহৃত সনদটি যাচাই না করে ভিন্ন একটি সনদের ভিত্তিতে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। ফলে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
তিনি তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে (নারাজি) বিষয়টি পুনরায় নিরপেক্ষভাবে তদন্ত এবং প্রয়োজন হলে বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন।
তার ভাষ্য, কোন সনদের ভিত্তিতে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সেই সনদের সত্যতা যাচাই করাই ছিল মূল বিষয়। কিন্তু সেটিই তদন্তের আওতায় না আসায় পুরো তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সব সনদ, নিয়োগের কাগজপত্র, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের যাচাই প্রতিবেদন এবং তদন্ত কর্মকর্তার প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকাশক ও সম্পাদক : অধ্যক্ষ মো. আবদুন নুর,
তৃতীয় তলা, নওশাদ মঞ্জিল, ঢকা - রায়পুর রোড, লক্ষ্মীপুর সদর, লক্ষ্মীপুর।
ইমেইল: abdunnur9051@gmail.com, ফোন: ০১৮২০-০৮৯০৫১
Copyright © 2026 দৈনিক সময়ের নুর. All rights reserved.